অধ্যায় ৩
সন্ধি
পাশাপাশি দুটি ধ্বনির মিলনকে সন্ধি বলে। দ্রুত উচ্চারণে ধ্বনি দুটি মিলে যায় বলে উচ্চারণে সহজতা ও শ্রুতিমাধুর্য আসে। সন্ধি প্রধানত তিন প্রকার — স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি ও বিসর্গসন্ধি।
সন্ধি পরিচিতি
সহজ করে বুঝি
একটা সহজ কথা দিয়ে শুরু করি — ‘সন্ধি’ মানে মিলন। দুটো ধ্বনি পাশাপাশি এসে দ্রুত উচ্চারণে মিলে গেলে, সেই মিলনটাই সন্ধি।
কেন হয়? — শুধু উচ্চারণ সহজ করতে আর কানে মধুর শোনাতে। ‘হিম-আলয়’ বলতে জিভ দুবার থামে; ‘হিমালয়’ বললে একবারে গড়িয়ে যায়।
তাই সন্ধি জোর করে বানানো নিয়ম নয় — উচ্চারণের স্বাভাবিক প্রবণতা। তিন রকম ধ্বনি মেলে বলে তিন রকম সন্ধি: স্বরে-স্বরে, ব্যঞ্জনে, আর বিসর্গে।
সংজ্ঞা ও উদ্দেশ্য
সন্নিহিত দুটি ধ্বনির মিলনকে সন্ধি বলে। এর উদ্দেশ্য — উচ্চারণে সহজতা ও শ্রুতিমাধুর্য রক্ষা।
- হিম + আলয় = হিমালয়
- দেব + আলয় = দেবালয়
প্রকারভেদ
- স্বরসন্ধি — স্বরে + স্বরে
- ব্যঞ্জনসন্ধি — ব্যঞ্জনে + স্বর/ব্যঞ্জন
- বিসর্গসন্ধি — বিসর্গ (ঃ) + স্বর/ব্যঞ্জন
তৎসম (সংস্কৃত) সন্ধি নিয়মনিষ্ঠ; বাংলা (খাঁটি) সন্ধি উচ্চারণনির্ভর।
নিজে চেষ্টা করো
সন্ধি (সংস্কৃত/তৎসম) প্রধানত কয় প্রকার?
স্বরসন্ধি
স্বরধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনির মিলনে স্বরসন্ধি হয়।
সহজ করে বুঝি
তুমি যখন তাড়াহুড়ো করে কথা বলো, পাশাপাশি দুটো স্বর এলে জিভ থামতে চায় না — ওরা মিশে যায়। এটাই স্বরসন্ধি।
‘বিদ্যা’ + ‘আলয়’ — দুটোই ‘আ’। দ্রুত বললে দুই ‘আ’ মিশে এক লম্বা ‘আ’ → বিদ্যালয়। তাই নিয়ম: একই জাতের স্বর মিশে লম্বা হয় (অ/আ + অ/আ = আ)।
এবার ভিন্ন স্বর — ‘নর’ + ‘ইন্দ্র’ (অ + ই)। এক জাতের নয়, লম্বা হবে না; জিভ মাঝামাঝি একটা স্বর বেছে নেয় — ‘এ’। তাই নরেন্দ্র। মুখে উচ্চারণ করে দেখো, নিজেই টের পাবে।
মূল কথা মনে রাখো — কাছাকাছি স্বর মিশে উচ্চারণ সহজ করে। এটুকু বুঝলে নিচের সূত্র-চার্ট শুধু মিলিয়ে নেওয়ার ব্যাপার।
স্বরসন্ধির সূত্র — এক নজরে
| পূর্বস্বর | পরস্বর | মিলিত হয় | উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| অ/আ | অ/আ | আ | হিম+আলয়=হিমালয় |
| অ/আ | ই/ঈ | এ | নর+ইন্দ্র=নরেন্দ্র |
| অ/আ | উ/ঊ | ও | সূর্য+উদয়=সূর্যোদয় |
| অ/আ | ঋ | অর্ | দেব+ঋষি=দেবর্ষি |
| অ/আ | এ/ঐ | ঐ | জন+এক=জনৈক |
| অ/আ | ও/ঔ | ঔ | বন+ওষধি=বনৌষধি |
| ই/ঈ | ই/ঈ | ঈ | অতি+ইত=অতীত |
| উ/ঊ | উ/ঊ | ঊ | ভানু+উদয়=ভানূদয় |
| ই/ঈ | ভিন্ন স্বর | য-ফলা (্য) | অতি+অন্ত=অত্যন্ত |
| উ/ঊ | ভিন্ন স্বর | ব-ফলা | সু+অল্প=স্বল্প |
| এ/ঐ/ও/ঔ | স্বর | অয়্/আয়্/অব্/আব্ | নে+অন=নয়ন |
অ/আ + অ/আ = আ (বিস্তারিত উদাহরণ)
| সন্ধিবিচ্ছেদ | সন্ধি |
|---|---|
| নর + অধম | নরাধম |
| হিম + আলয় | হিমালয় |
| দেব + আলয় | দেবালয় |
| বিদ্যা + আলয় | বিদ্যালয় |
| মহা + আশয় | মহাশয় |
| রত্ন + আকর | রত্নাকর |
| কথা + অমৃত | কথামৃত |
অ/আ + ই/ঈ = এ ; অ/আ + উ/ঊ = ও
| সন্ধিবিচ্ছেদ | সন্ধি | নিয়ম |
|---|---|---|
| সুর + ইন্দ্র | সুরেন্দ্র | অ+ই=এ |
| গণ + ঈশ | গণেশ | অ+ঈ=এ |
| মহা + ঈশ | মহেশ | আ+ঈ=এ |
| নীল + উৎপল | নীলোৎপল | অ+উ=ও |
| পর + উপকার | পরোপকার | অ+উ=ও |
| হিত + উপদেশ | হিতোপদেশ | অ+উ=ও |
| মহা + উৎসব | মহোৎসব | আ+উ=ও |
অ/আ + ঋ/এ/ঐ/ও/ঔ
| সন্ধিবিচ্ছেদ | সন্ধি | নিয়ম |
|---|---|---|
| দেব + ঋষি | দেবর্ষি | অ+ঋ=অর্ |
| মহা + ঋষি | মহর্ষি | আ+ঋ=অর্ |
| জন + এক | জনৈক | অ+এ=ঐ |
| মত + ঐক্য | মতৈক্য | অ+ঐ=ঐ |
| বন + ওষধি | বনৌষধি | অ+ও=ঔ |
| পরম + ঔষধ | পরমৌষধ | অ+ঔ=ঔ |
ই/উ + ভিন্ন স্বর = য-ফলা / ব-ফলা
| সন্ধিবিচ্ছেদ | সন্ধি | নিয়ম |
|---|---|---|
| অতি + অন্ত | অত্যন্ত | ই+অ=্য |
| ইতি + আদি | ইত্যাদি | ই+আ=্য |
| প্রতি + এক | প্রত্যেক | ই+এ=্য |
| সু + অল্প | স্বল্প | উ+অ=ব-ফলা |
| সু + আগত | স্বাগত | উ+আ=ব-ফলা |
| অনু + এষণ | অন্বেষণ | উ+এ=ব-ফলা |
এ/ঐ/ও/ঔ + স্বর
| সন্ধিবিচ্ছেদ | সন্ধি | নিয়ম |
|---|---|---|
| নে + অন | নয়ন | এ+অ=অয়্ |
| গৈ + অক | গায়ক | ঐ+অ=আয়্ |
| পো + অন | পবন | ও+অ=অব্ |
| নৌ + ইক | নাবিক | ঔ+ই=আব্ |
| ভৌ + উক | ভাবুক | ঔ+উ=আব্ |
নিজে চেষ্টা করো
‘বিদ্যা + আলয়’ সন্ধি করলে কী হয়, কোন সূত্রে?
ব্যঞ্জনসন্ধি
ব্যঞ্জনের সঙ্গে স্বর বা ব্যঞ্জনের মিলনে ব্যঞ্জনসন্ধি হয়।
সহজ করে বুঝি
এখানে একটা ব্যঞ্জন তার প্রতিবেশীর প্রভাবে বদলে যায় — যেন পাশের ধ্বনির সঙ্গে মিশে তার মতোই হয়ে যায়। একে বলে সমীভবন।
‘সৎ’ + ‘জন’ ভাবো। ‘ৎ’ তার পাশের ‘জ’-এর সঙ্গে মিশে ‘জ’-এর মতো হয়ে যায় → সজ্জন।
আরেকটা মজার নিয়ম: ‘ম’-এর পরে যে বর্গের ব্যঞ্জন আসে, ‘ম’ সেই বর্গের নাসিক্য (৫ম বর্ণ) হয়ে যায়। ‘সম’ + ‘চয়’ → ‘ম’ চ-বর্গের নাসিক্য ‘ঞ’ হয়ে সঞ্চয়। মুখে বললেই টের পাবে কেন।
ত/দ + চ/ছ = চ্চ/চ্ছ
- সৎ + চিন্তা = সচ্চিন্তা
- উৎ + চ্বাস = উচ্ছ্বাস
- তৎ + ছবি = তচ্ছবি
ত/দ + জ = জ্জ ; ত/দ + হ = দ্ধ
- সৎ + জন = সজ্জন
- উৎ + জ্বল = উজ্জ্বল
- উৎ + হার = উদ্ধার
- পদ + হতি = পদ্ধতি
ম + বর্গীয় ব্যঞ্জন = ঐ বর্গের নাসিক্য
- সম + চয় = সঞ্চয়
- সম + গীত = সঙ্গীত
- সম + বাদ = সংবাদ
- কিম + কর = কিঙ্কর
স্বর/নাসিক্য + ছ = চ্ছ
- আ + ছাদন = আচ্ছাদন
- প্র + ছদ = প্রচ্ছদ
- বি + ছেদ = বিচ্ছেদ
নিজে চেষ্টা করো
‘সৎ + চরিত্র’ সন্ধি করলে?
বিসর্গসন্ধি
বিসর্গ (ঃ) ধ্বনির সঙ্গে স্বর বা ব্যঞ্জনের মিলনে বিসর্গসন্ধি হয়।
সহজ করে বুঝি
একটা গোপন কথা বলি — বিসর্গ (ঃ) আসলে লুকানো ‘র’ বা ‘স’-এর ছদ্মবেশ। সন্ধির সময় সে আসল রূপে ফিরে আসে।
‘পুনঃ’-এর বিসর্গ আসলে ‘র’ (পুনর্)। তাই ‘পুনঃ’ + ‘আয়’ = পুনরায়। আবার ‘নমঃ’-এর বিসর্গ ‘স’ জাতীয়, তাই ‘নমঃ’ + ‘কার’ = নমস্কার।
তাই প্রশ্ন দেখেই ভাবো — এই বিসর্গটা ‘র’ থেকে এসেছে না ‘স’ থেকে? উত্তর সেখানেই লুকানো।
র-জাত বিসর্গ (বিসর্গ+স্বর/ঘোষ ব্যঞ্জন = র/রেফ)
| সন্ধিবিচ্ছেদ | সন্ধি |
|---|---|
| পুনঃ + আয় | পুনরায় |
| পুনঃ + জন্ম | পুনর্জন্ম |
| অন্তঃ + গত | অন্তর্গত |
| প্রাতঃ + রাশ | প্রাতরাশ |
| অহঃ + নিশা | অহর্নিশ |
স-জাত বিসর্গ (বিসর্গ+ক/প/ত = স/ষ)
| সন্ধিবিচ্ছেদ | সন্ধি |
|---|---|
| নমঃ + কার | নমস্কার |
| পুরঃ + কার | পুরস্কার |
| তিরঃ + কার | তিরস্কার |
| ভাঃ + কর | ভাস্কর |
| শিরঃ + ছেদ | শিরশ্ছেদ |
অ + বিসর্গ + অ/ঘোষ = ও
| সন্ধিবিচ্ছেদ | সন্ধি |
|---|---|
| ততঃ + অধিক | ততোধিক |
| মনঃ + অভিলাষ | মনোভিলাষ |
| যশঃ + অভিলাষ | যশোভিলাষ |
| মনঃ + যোগ | মনোযোগ |
| তপঃ + বন | তপোবন |
নিজে চেষ্টা করো
‘নিঃ + আকার’ = ? বিসর্গটি কোন জাতের?
নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি
কিছু সন্ধি কোনো নিয়ম মানে না — গুরুজনের ব্যবহারে সিদ্ধ বলে এদের ‘নিপাতনে সিদ্ধ’ বলে।
সহজ করে বুঝি
সব নিয়মেরই কিছু ব্যতিক্রম থাকে, তাই না? ভাষাতেও তাই। কিছু সন্ধি কোনো সূত্রে মেলে না — বহুকাল ধরে মানুষ এভাবেই বলে আসছে বলে এগুলো ‘সিদ্ধ’ (গৃহীত)।
এগুলো বোঝার চেষ্টা কোরো না, শুধু চিনে রাখো — সংখ্যায় গুটিকয়েক। যেমন ‘কুলটা, মনীষা, গবাক্ষ, প্রৌঢ়, মার্তণ্ড’। পরীক্ষায় এই কয়টাই ঘুরেফিরে আসে।
উদাহরণ
- কুল + অটা = কুলটা
- মনস + ঈষা = মনীষা
- গো + অক্ষ = গবাক্ষ
- প্র + ঊঢ় = প্রৌঢ়
- মার্ত + অণ্ড = মার্তণ্ড
এগুলো নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না, মুখস্থ রাখতে হয়।
নিজে চেষ্টা করো
‘গো + অক্ষ’ সাধারণ সূত্রে হয় না — কী হয়?
পরীক্ষার ফাঁদ
- সন্ধি ধ্বনির মিলন; সমাস অর্থের/পদের মিলন — গুলিয়ে ফেলা যাবে না।
- ‘কুলটা, মনীষা, গবাক্ষ, প্রৌঢ়’ নিপাতনে সিদ্ধ — নিয়মে মেলে না।
- বাংলা (খাঁটি) সন্ধি উচ্চারণনির্ভর; তৎসম সন্ধি নিয়মনির্ভর।
মনে রাখার কৌশল
- স্বরসন্ধির মূল সূত্র মনে রাখো: অ/আ + অ/আ = আ; + ই = এ; + উ = ও।
- নিপাতনে সিদ্ধ ৫টি: কুলটা, মনীষা, গবাক্ষ, প্রৌঢ়, মার্তণ্ড।
সারসংক্ষেপ · এক নজরে রিভিশন
- ১.সন্ধি (তৎসম) ৩ প্রকার: স্বর, ব্যঞ্জন, বিসর্গ।
- ২.স্বরসন্ধি: অ/আ+অ/আ=আ (বিদ্যালয়); ই+ই=ঈ (গিরীন্দ্র); উ+উ=ঊ (ভানূদয়)।
- ৩.বিসর্গ আসলে ‘র’ বা ‘স’-এর ছদ্মবেশ — পুনরায় (র), নমস্কার (স)।
- ৪.নিপাতনে সিদ্ধ = নিয়ম মানে না, মুখস্থ: গবাক্ষ, কুলটা, বনস্পতি, পরস্পর।