পরমাণু শক্তি কমিশন কী কাজ করে? রূপপুর ও গবেষণা চুল্লি
পরমাণু শক্তি কমিশন কবে প্রতিষ্ঠিত, কী কাজ করে, সাভারের গবেষণা চুল্লি ও রূপপুর কেন্দ্র কোথায় — ফিশন-ফিউশনসহ পরীক্ষায় আসা তথ্য এক জায়গায়।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে, স্বাধীনতার ঠিক পরের বছরগুলোতে। এই সালটাই পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশিবার এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন শুধু সাল ধরে আসে না — কমিশনের কাজ কী, সাভারে কী আছে, রূপপুর কোন জেলায়, ফিশন না ফিউশনে বিদ্যুৎ হয় — সব দিক থেকেই আসে।
তাই একটা সাল মুখস্থ করে থেমো না। নিচে প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পারমাণবিক বিক্রিয়ার মৌলিক বিজ্ঞান পর্যন্ত পুরো ছবিটা সাজানো আছে, শেষে ভুল-ফাঁদ আর এক নজরে রিভিশন টেবিল।
পরমাণু শক্তি কমিশন কবে প্রতিষ্ঠিত হয়
সংক্ষেপে উত্তরটা এমন:
| প্রশ্ন | উত্তর |
|---|---|
| প্রতিষ্ঠার সাল | ১৯৭৩ |
| ইংরেজি নাম | Bangladesh Atomic Energy Commission (BAEC) |
| মূল উদ্দেশ্য | পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার |
| নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় | বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় |
| ধরন | গবেষণা ও উন্নয়নমূলক সরকারি সংস্থা |
| নিয়ন্ত্রক সংস্থা কি এটি? | না, নিয়ন্ত্রক আলাদা — BAERA |
শেষ সারিটা মনে রেখো। এখান থেকেই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়, আর নিচে আলাদা সেকশনে এটা বিস্তারিত এসেছে।
একটা শব্দ খেয়াল করো — "শান্তিপূর্ণ ব্যবহার"। কমিশনের গোটা কাজের দর্শনটাই এই দুই শব্দে। অস্ত্র নয়, বিদ্যুৎ-কৃষি-চিকিৎসা-শিল্প। বিসিএস ও ব্যাংকের প্রশ্নে এই শব্দবন্ধটি প্রায়ই অপশনে বসানো থাকে।
কমিশন আসলে কী কাজ করে
কমিশনকে অনেকে শুধু "বিদ্যুৎ বানানোর সংস্থা" ভাবে। ব্যাপারটা তার চেয়ে অনেক বড়। কাজগুলো মোটামুটি পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়:
- গবেষণা ও উন্নয়ন — নিউক্লিয়ার বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানে গবেষণা পরিচালনা
- কৃষি প্রয়োগ — তেজস্ক্রিয় পদ্ধতিতে ফসলের উন্নত জাত উদ্ভাবন, মাটি ও সার ব্যবস্থাপনা
- চিকিৎসা প্রয়োগ — ক্যানসার নির্ণয় ও চিকিৎসায় তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের ব্যবহার
- শিল্প প্রয়োগ — ধাতুর ফাটল পরীক্ষা, খাদ্য সংরক্ষণে বিকিরণ প্রয়োগ
- জনশক্তি তৈরি — পারমাণবিক প্রযুক্তির জন্য দক্ষ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী গড়ে তোলা
অর্থাৎ কমিশন মূলত একটি বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানি নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন দেশের বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, আর সেই খাতের কাঠামো বুঝতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড নিয়ে লেখাটি পড়ে নিও — রূপপুরের বিদ্যুৎ শেষ পর্যন্ত যে জাতীয় গ্রিডে যাবে, সেই গ্রিডের গল্প ওখানে আছে।
সাভারের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও দেশের একমাত্র গবেষণা চুল্লি
ঢাকার অদূরে সাভারে কমিশনের সবচেয়ে বড় স্থাপনা — পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (Atomic Energy Research Establishment)। দেশের একমাত্র গবেষণা চুল্লি বা রিসার্চ রিঅ্যাক্টর এখানেই।
গবেষণা চুল্লি জিনিসটা কী? এটি ছোট আকারের একটি পারমাণবিক চুল্লি, যার কাজ বিদ্যুৎ বানানো নয়। এর কাজ নিউট্রন সরবরাহ করা — যেই নিউট্রন দিয়ে বিজ্ঞানীরা নানা পরীক্ষা চালান, তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ তৈরি করেন, উপাদান বিশ্লেষণ করেন।
দুটোর পার্থক্য একবারে দেখে নাও:
| দিক | গবেষণা চুল্লি | বিদ্যুৎ চুল্লি |
|---|---|---|
| মূল উদ্দেশ্য | নিউট্রন উৎপাদন, গবেষণা | বিদ্যুৎ উৎপাদন |
| আকার ও ক্ষমতা | ছোট, কয়েক মেগাওয়াট | বিশাল, হাজার মেগাওয়াটের ঘরে |
| উৎপন্ন তাপ | কাজে লাগানো হয় না | বাষ্প বানিয়ে টারবাইন ঘোরায় |
| বাংলাদেশে অবস্থান | সাভার | রূপপুর, পাবনা |
সাভারের চুল্লিটি TRIGA Mark II ধরনের, স্থাপিত হয় আশির দশকে। "সাভার" আর "রূপপুর" — এই দুটো নাম গুলিয়ে ফেলার প্রবণতা পরীক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গবেষণা মানে সাভার, বিদ্যুৎ মানে রূপপুর — এভাবে গেঁথে নাও। এমন জোড়া-তথ্যের অনুশীলনের জন্য সাধারণ বিজ্ঞানের প্রশ্নব্যাংক কাজে দেবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোথায়, ক্ষমতা কত
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন আসে প্রায় প্রতি বছর। তিন স্তরে মনে রাখো — জেলা, উপজেলা, নদী।
| প্রশ্ন | উত্তর |
|---|---|
| জেলা | পাবনা |
| উপজেলা | ঈশ্বরদী |
| স্থান | রূপপুর |
| নদীর তীরে | পদ্মা |
| ইউনিট সংখ্যা | ২টি |
| প্রতিটি ইউনিটের ক্ষমতা | ১২০০ মেগাওয়াট |
| মোট ক্ষমতা | ২৪০০ মেগাওয়াট |
| সহযোগী দেশ | রাশিয়া |
| বিশেষত্ব | দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র |
"পাবনা" পর্যন্ত অনেকেই পারে, কিন্তু "ঈশ্বরদী উপজেলা" জিজ্ঞেস করলে আটকে যায়। আর "কোন নদীর তীরে" প্রশ্নের উত্তরে অনেকে যমুনা লিখে ফেলে — উত্তর পদ্মা।
সংখ্যাটাও সহজ: ১২০০ × ২ = ২৪০০ মেগাওয়াট। যদি প্রশ্নে শুধু "একটি ইউনিটের ক্ষমতা" চায়, উত্তর ১২০০; "কেন্দ্রের মোট ক্ষমতা" চাইলে ২৪০০। এই দুইয়ের মধ্যে সাবধানে চোখ বুলিয়ো।
চুল্লিগুলো রুশ VVER-১২০০ ধরনের, যা চাপযুক্ত পানি ব্যবহার করে। কেন্দ্রের চালুর তারিখ ও বর্তমান অগ্রগতি নিয়ে বাজারে অনেক পুরোনো তথ্য ঘোরে। এই লেখায় সেটা লিখছি না ইচ্ছে করেই — নির্মাণ ও কমিশনিংয়ের কাজ ধাপে ধাপে চলছে, আর সাল-তারিখ বদলায়। সাম্প্রতিক অবস্থার জন্য কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স অংশটি দেখে নিও, ওখানেই হালনাগাদ তথ্য থাকে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কীভাবে তৈরি হয়
এখানে একটা বড় ভুল ধারণা ভাঙা দরকার। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র "পরমাণু থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ" বানায় না। এটি আসলে একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যেখানে কয়লা বা গ্যাসের বদলে তাপের উৎস পারমাণবিক বিক্রিয়া।
ধাপগুলো এরকম:
১. চুল্লির ভেতরে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস ভেঙে বিপুল তাপ উৎপন্ন হয় ২. সেই তাপ পানিকে গরম করে উচ্চচাপের বাষ্প বানায় ৩. বাষ্প টারবাইনের ব্লেডে ধাক্কা দিয়ে টারবাইন ঘোরায় ৪. টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটর ঘুরে বিদ্যুৎ তৈরি করে ৫. কনডেনসারে বাষ্প ঠান্ডা হয়ে আবার পানিতে পরিণত হয়
অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত কাজটা করে সেই পুরোনো তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ — জেনারেটরের কুণ্ডলী চুম্বকক্ষেত্রে ঘুরলে বিদ্যুৎ। শুধু তাপের উৎসটা আলাদা।
চুল্লির ভেতরে দুটো জিনিসের নাম মনে রাখা দরকার:
- মডারেটর — দ্রুতগতির নিউট্রনের গতি কমিয়ে দেয়, যাতে সেগুলো ফিশন ঘটাতে পারে। পানি, ভারী পানি বা গ্রাফাইট মডারেটর হিসেবে ব্যবহৃত হয়
- কন্ট্রোল রড — অতিরিক্ত নিউট্রন শুষে নিয়ে বিক্রিয়ার গতি নিয়ন্ত্রণ করে। বোরন ও ক্যাডমিয়াম এ কাজে ব্যবহৃত হয়
পরীক্ষায় "চুল্লিতে নিউট্রন শোষণে ব্যবহৃত হয় কোনটি" প্রশ্নের উত্তর — ক্যাডমিয়াম বা বোরন। আর "ভারী পানির কাজ কী" প্রশ্নের উত্তর — মডারেটর হিসেবে কাজ করা।
ফিশন আর ফিউশনের পার্থক্য কী
এই দুটো শব্দ গুলিয়ে ফেলা সবচেয়ে সাধারণ ভুল। মূল কথা এক লাইনে — ফিশন মানে ভাঙা, ফিউশন মানে জোড়া লাগা।
| দিক | নিউক্লিয়ার ফিশন | নিউক্লিয়ার ফিউশন |
|---|---|---|
| কী ঘটে | ভারী নিউক্লিয়াস ভেঙে ছোট হয় | হালকা নিউক্লিয়াস জোড়া লেগে ভারী হয় |
| জ্বালানি | ইউরেনিয়াম, প্লুটোনিয়াম | হাইড্রোজেনের আইসোটোপ |
| কোথায় ঘটে | পারমাণবিক চুল্লিতে, পারমাণবিক বোমায় | সূর্য ও নক্ষত্রে, হাইড্রোজেন বোমায় |
| প্রয়োজনীয় শর্ত | মুক্ত নিউট্রনের আঘাত | অতি উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপ |
| নিয়ন্ত্রণ | নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তাই বিদ্যুৎ হয় | বাণিজ্যিকভাবে নিয়ন্ত্রণ এখনো কঠিন |
| তেজস্ক্রিয় বর্জ্য | তৈরি হয় | তুলনায় অনেক কম |
তাই মনে রাখো — রূপপুরে ফিশন, সূর্যে ফিউশন। প্রশ্নে যদি আসে "সূর্যের শক্তির উৎস কী", উত্তর ফিউশন। আর "পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোন বিক্রিয়া ঘটে", উত্তর ফিশন।
মজার ব্যাপার হলো, দুই ক্ষেত্রেই শক্তি আসে একই সূত্র থেকে — ভরের সামান্য অংশ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, আইনস্টাইনের E = mc² অনুসারে। ভরের এই ঘাটতিকে বলে ভরত্রুটি বা mass defect।
ইউরেনিয়াম কেন জ্বালানি, চেইন রিঅ্যাকশন কী
ইউরেনিয়ামকে জ্বালানি বানানো হয় কারণ এর নিউক্লিয়াস ভারী ও অস্থিতিশীল — সামান্য ধাক্কাতেই ভেঙে যায় এবং বিপুল শক্তি ছাড়ে।
তবে সব ইউরেনিয়াম এক নয়:
| আইসোটোপ | প্রকৃতিতে পরিমাণ | ফিশনে ভূমিকা |
|---|---|---|
| ইউরেনিয়াম-২৩৫ | প্রায় ০.৭ শতাংশ | সহজে ফিশনযোগ্য, আসল জ্বালানি |
| ইউরেনিয়াম-২৩৮ | প্রায় ৯৯ শতাংশের বেশি | সহজে ফিশন হয় না |
প্রকৃতিতে কাজের জিনিসটাই কম। তাই ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর অনুপাত বাড়ানো হয়, একে বলে সমৃদ্ধকরণ বা এনরিচমেন্ট। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানিতে সাধারণত অল্প মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম লাগে; অস্ত্রের জন্য লাগে অনেক বেশি মাত্রার সমৃদ্ধকরণ। এই পার্থক্যটুকুই শান্তিপূর্ণ ব্যবহার আর অস্ত্রের মধ্যে সীমারেখা।
এবার চেইন রিঅ্যাকশন। একটি নিউট্রন গিয়ে একটি ইউরেনিয়াম-২৩৫ নিউক্লিয়াসে আঘাত করল। নিউক্লিয়াসটি ভেঙে গেল, শক্তি বেরোল, আর সঙ্গে বেরোল আরও দুই-তিনটি নিউট্রন। সেই নিউট্রনগুলো গিয়ে আরও নিউক্লিয়াস ভাঙল। এভাবে বিক্রিয়াটি নিজেই নিজেকে চালিয়ে যায় — এটাই শৃঙ্খল বিক্রিয়া।
এই শৃঙ্খল দুই রকম হতে পারে:
- নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন — কন্ট্রোল রড দিয়ে গতি বেঁধে রাখা হয়, ফলে স্থির হারে তাপ পাওয়া যায়। পারমাণবিক চুল্লিতে এটাই ঘটে
- অনিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন — মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত শক্তি বেরিয়ে আসে। পারমাণবিক বোমায় এটাই ঘটে
ইতিহাসের দুটো নাম কাজে লাগবে: ১৯৩৮ সালে অটো হান ও ফ্রিটজ স্ট্রাসম্যান ফিশন আবিষ্কার করেন, আর ১৯৪২ সালে এনরিকো ফার্মির নেতৃত্বে প্রথম নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন ঘটানো হয়।
তেজস্ক্রিয়তা ও তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ সহজ ভাষায়
কিছু পরমাণুর নিউক্লিয়াস অস্থিতিশীল। স্থিতিশীল হওয়ার জন্য তারা নিজে থেকেই কণা বা রশ্মি ছাড়তে থাকে। এই স্বতঃস্ফূর্ত বিকিরণই তেজস্ক্রিয়তা।
তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেন হেনরি বেকেরেল, ১৮৯৬ সালে। এরপর মেরি কুরি ও পিয়ের কুরি রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম আবিষ্কার করেন।
তিন ধরনের বিকিরণ চেনো:
| রশ্মি | আসলে কী | চার্জ | ভেদনক্ষমতা |
|---|---|---|---|
| আলফা | হিলিয়াম নিউক্লিয়াস | ধনাত্মক | সবচেয়ে কম, কাগজেই আটকে যায় |
| বিটা | দ্রুতগতির ইলেকট্রন | ঋণাত্মক | মাঝারি, পাতলা ধাতু ভেদ করে |
| গামা | তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ | নিরপেক্ষ | সবচেয়ে বেশি, সিসা লাগে আটকাতে |
আইসোটোপ মানে একই মৌলের ভিন্ন ভরসংখ্যার পরমাণু — প্রোটন সংখ্যা এক, নিউট্রন সংখ্যা আলাদা। যেমন কার্বন-১২ ও কার্বন-১৪ দুটোই কার্বন, কিন্তু নিউট্রন সংখ্যা ভিন্ন। যেসব আইসোটোপ বিকিরণ ছাড়ে, সেগুলোই তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ।
আরেকটি জরুরি ধারণা অর্ধায়ু বা হাফ-লাইফ — যে সময়ে কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থের অর্ধেক পরিমাণ ক্ষয়ে যায়। কার্বন-১৪-এর অর্ধায়ু ব্যবহার করে জীবাশ্ম ও প্রত্নবস্তুর বয়স নির্ণয় করা হয়, একে বলে কার্বন ডেটিং। এই ধরনের ধারণাভিত্তিক প্রশ্ন মিলিয়ে দেখতে সাধারণ বিজ্ঞানের প্র্যাকটিস অংশ থেকে কয়েকটা সেট শেষ করে ফেলো।
কৃষি, চিকিৎসা ও শিল্পে তেজস্ক্রিয় প্রযুক্তি
কমিশনের কাজের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক এটি, অথচ পড়ার সময় সবাই এড়িয়ে যায়। অথচ প্রশ্ন এখান থেকেও আসে।
কৃষিতে:
- বিকিরণ প্রয়োগে বীজে মিউটেশন ঘটিয়ে উচ্চফলনশীল ও রোগ-সহনশীল জাত উদ্ভাবন
- তেজস্ক্রিয় ট্রেসার দিয়ে গাছ কতটুকু সার শোষণ করছে তা মাপা
- বন্ধ্যা পোকা পদ্ধতিতে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ দমন
চিকিৎসায়:
- ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি, যেখানে কোবাল্ট-৬০ থেকে গামা রশ্মি ব্যবহৃত হয়
- থাইরয়েড রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় আয়োডিন-১৩১
- হাড় ও অঙ্গের স্ক্যানে তেজস্ক্রিয় ট্রেসার
শিল্পে ও অন্যত্র:
- ধাতুর ঢালাই বা ওয়েল্ডিংয়ে ফাটল খুঁজতে গামা রেডিওগ্রাফি
- খাদ্য সংরক্ষণে বিকিরণ প্রয়োগ, যাতে অণুজীব মরে যায়
- কাগজ বা প্লাস্টিক শিটের পুরুত্ব মাপায় বিকিরণ গেজ
এখান থেকে সবচেয়ে বেশি আসা প্রশ্ন — "ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় মৌল কোনটি?" উত্তর কোবাল্ট-৬০।
BAERA কী, কমিশন থেকে আলাদা কেন
এই জায়গাটা ভালো করে বোঝো, কারণ সাম্প্রতিক প্রশ্নপত্রে এখান থেকে ফাঁদ পাতা হয়।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BAERA) হলো দেশের পারমাণবিক নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংস্থা। এটি পরমাণু শক্তি কমিশন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান।
| দিক | পরমাণু শক্তি কমিশন (BAEC) | নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BAERA) |
|---|---|---|
| ভূমিকা | গবেষণা ও প্রয়োগকারী সংস্থা | নিয়ন্ত্রক ও তদারককারী সংস্থা |
| কাজ | গবেষণা, প্রযুক্তির ব্যবহার | লাইসেন্স, নিরাপত্তা, বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ |
| প্রতিষ্ঠা | ১৯৭৩ | অনেক পরে, আলাদা আইনে |
যুক্তিটা সহজ — যে সংস্থা নিজে চুল্লি চালায়, সে নিজেই নিজের নিরাপত্তা সনদ দিতে পারে না। তাই বিশ্বজুড়ে নিয়মই হলো পরিচালনাকারী ও নিয়ন্ত্রক আলাদা রাখা। বাংলাদেশও সেই আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই BAERA গঠন করেছে।
আইএইএ সম্পর্কে যা জানতেই হবে
পারমাণবিক প্রশ্ন এলে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা প্রায় সঙ্গেই আসে।
| প্রশ্ন | উত্তর |
|---|---|
| পুরো নাম | International Atomic Energy Agency (IAEA) |
| প্রতিষ্ঠা | ১৯৫৭ |
| সদর দপ্তর | ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া |
| মূল কাজ | পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা তদারকি |
| শান্তিতে নোবেল | ২০০৫ সালে |
সদর দপ্তর নিয়ে ভুল হয় সবচেয়ে বেশি। অনেকে জেনেভা লিখে ফেলে, কারণ জাতিসংঘের অনেক সংস্থাই জেনেভায়। কিন্তু আইএইএ-র ঠিকানা ভিয়েনা। মনে রাখার সহজ সূত্র — "পরমাণুর ঠিকানা ভিয়েনা"। আন্তর্জাতিক সংস্থার সদর দপ্তর মেলানোর অনুশীলনের জন্য প্রশ্নব্যাংক ঘেঁটে দেখো, একই ধাঁচে অনেকগুলো এসেছে।
যেসব ভুল সবচেয়ে বেশি হয়
পরীক্ষার হলে সময় কম, আর এই ভুলগুলোই নম্বর কাটে:
| ভুল ধারণা | সঠিক তথ্য |
|---|---|
| কমিশন প্রতিষ্ঠিত ১৯৭২ সালে | প্রতিষ্ঠিত ১৯৭৩ সালে |
| গবেষণা চুল্লি রূপপুরে | গবেষণা চুল্লি সাভারে |
| রূপপুর যমুনার তীরে | রূপপুর পদ্মার তীরে |
| রূপপুরের মোট ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট | একটি ইউনিট ১২০০, মোট ২৪০০ |
| রূপপুর সিরাজগঞ্জ জেলায় | পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলায় |
| বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফিউশন ঘটে | ফিশন ঘটে; ফিউশন হয় সূর্যে |
| কমিশনই নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক | নিয়ন্ত্রক BAERA, আলাদা সংস্থা |
| আইএইএ-র সদর দপ্তর জেনেভা | ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া |
| ইউরেনিয়াম-২৩৮ মূল জ্বালানি | মূল ফিশনযোগ্য আইসোটোপ ইউরেনিয়াম-২৩৫ |
তালিকাটা একবার পড়ে রাখলেই অর্ধেক ফাঁদ কেটে যাবে। বাকিটা কাটে অনুশীলনে — বাংলাদেশ বিষয়াবলির প্র্যাকটিস অংশে প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত প্রশ্ন আলাদা করে সাজানো আছে।
পরীক্ষায় যেভাবে প্রশ্ন আসে
প্রশ্নের ধরন মোটামুটি ছয় রকম:
১. সাল ধরে — বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন কবে প্রতিষ্ঠিত হয়? ২. অবস্থান ধরে — রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোন জেলায় অবস্থিত? ৩. সংখ্যা ধরে — রূপপুরের মোট উৎপাদন ক্ষমতা কত মেগাওয়াট? ৪. ধারণা ধরে — পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোন বিক্রিয়া ঘটে? ৫. আন্তর্জাতিক সংযোগ ধরে — আইএইএ-র সদর দপ্তর কোথায়? ৬. প্রয়োগ ধরে — ক্যানসার চিকিৎসায় কোন তেজস্ক্রিয় মৌল ব্যবহৃত হয়?
লক্ষ করো, বিজ্ঞান আর বাংলাদেশ বিষয়াবলি — দুই বিষয় থেকেই এই টপিক আসে। ফিশন-ফিউশন, তেজস্ক্রিয়তা, আইসোটোপ যায় সাধারণ বিজ্ঞানে; কমিশন, রূপপুর, সাভার যায় বাংলাদেশ বিষয়াবলিতে। তাই একই পড়া দুই জায়গায় কাজে লাগছে।
সময় ধরে নিজেকে যাচাই করতে চাইলে একটা মক টেস্ট দিয়ে দেখো — কোন ধাঁচের প্রশ্নে আটকাচ্ছ, সেটা ধরা পড়ে যাবে।
এক নজরে মনে রাখার তথ্য
শেষ মুহূর্তের রিভিশনের জন্য পুরোটা এক টেবিলে:
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| কমিশন প্রতিষ্ঠা | ১৯৭৩ |
| ইংরেজি নাম | Bangladesh Atomic Energy Commission |
| মন্ত্রণালয় | বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় |
| মূলনীতি | পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার |
| গবেষণা প্রতিষ্ঠান | সাভার |
| একমাত্র গবেষণা চুল্লি | সাভারে |
| প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র | রূপপুর |
| রূপপুরের জেলা ও উপজেলা | পাবনা, ঈশ্বরদী |
| নদী | পদ্মা |
| ইউনিট ও ক্ষমতা | ২টি, প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট |
| মোট ক্ষমতা | ২৪০০ মেগাওয়াট |
| সহযোগী দেশ | রাশিয়া |
| নিয়ন্ত্রক সংস্থা | BAERA |
| বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিক্রিয়া | নিউক্লিয়ার ফিশন |
| সূর্যের বিক্রিয়া | নিউক্লিয়ার ফিউশন |
| প্রধান জ্বালানি | ইউরেনিয়াম-২৩৫ |
| কন্ট্রোল রডের উপাদান | বোরন, ক্যাডমিয়াম |
| আইএইএ প্রতিষ্ঠা ও সদর দপ্তর | ১৯৫৭, ভিয়েনা |
| তেজস্ক্রিয়তার আবিষ্কারক | হেনরি বেকেরেল |
| ক্যানসার চিকিৎসার মৌল | কোবাল্ট-৬০ |
এই টেবিলটা পরীক্ষার আগের রাতে দুই মিনিটে একবার চোখ বুলিয়ে নিতে পারবে। আর পড়া শেষে সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চাইলে প্র্যাকটিস অংশে গিয়ে কয়েকটা প্রশ্ন মেরে দেখো — যা পড়লে, তার কতটুকু আসলে ধরে রাখতে পারলে, সেটা তখনই বোঝা যায়।
Ahosan Habib
@ahosanhabib922
অচিনপুরের নির্মাতা। BCS ও চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে লেখেন — সিলেবাস, ব্যাকরণ ও পড়ার কৌশল।