সন্ধি বিচ্ছেদের নিয়ম — উদাহরণসহ পূর্ণ গাইড
স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি ও বিসর্গসন্ধির সব নিয়ম উদাহরণসহ, নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধির তালিকা আর বিসিএসে বারবার আসা প্রশ্ন — এক জায়গায়।
বাংলা ব্যাকরণের যে অংশটা থেকে প্রায় প্রতিটি বিসিএস ও ব্যাংক পরীক্ষায় প্রশ্ন আসে, সেটা সন্ধি। ভালো খবর হলো এখানে মুখস্থের চেয়ে নিয়মের ভূমিকা বেশি — সূত্রগুলো একবার ধরতে পারলে অচেনা শব্দ দেখেও উত্তর করা যায়। খারাপ খবর হলো বেশিরভাগ পরীক্ষার্থী নিয়ম না বুঝে কেবল উদাহরণ মুখস্থ করে, তাই পরীক্ষায় নতুন শব্দ এলেই আটকে যায়।
এই লেখায় সন্ধি বিচ্ছেদের সব নিয়ম উদাহরণসহ সাজানো আছে — কোন স্বরের সাথে কোন স্বর মিললে কী হয়, ব্যঞ্জনসন্ধির সূত্রগুলো কী, বিসর্গসন্ধি কীভাবে চিনবে, আর কোনগুলো নিয়ম মানে না। শেষে আছে পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি আসা শব্দের তালিকা।
সন্ধি কাকে বলে
সন্নিহিত দুটি ধ্বনির মিলনকে সন্ধি বলে। দুটি শব্দ পাশাপাশি এলে উচ্চারণের সুবিধার জন্য শেষ ধ্বনি আর প্রথম ধ্বনি মিলে একটা নতুন ধ্বনি তৈরি করে।
উদাহরণ দেখলেই পরিষ্কার হবে:
- হিম + আলয় = হিমালয়
- দেব + আলয় = দেবালয়
"হিম আলয়" বলতে গেলে দুবার থামতে হয়, "হিমালয়" বলতে একবারও না। এই সহজতা আর শ্রুতিমাধুর্যই সন্ধির উদ্দেশ্য।
আর সন্ধি বিচ্ছেদ হলো এর উল্টো কাজ — মিলিত শব্দটাকে ভেঙে আগের দুই অংশে ফিরিয়ে নেওয়া। পরীক্ষায় সাধারণত এটাই চাওয়া হয়: "হিমালয়" শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ কী?
সন্ধি কত প্রকার ও কী কী
সন্ধি তিন প্রকার, আর ভাগটা হয় কোন ধরনের ধ্বনি মিলছে তার ভিত্তিতে:
| প্রকার | কী মিলছে | উদাহরণ |
|---|---|---|
| স্বরসন্ধি | স্বরধ্বনি + স্বরধ্বনি | হিম + আলয় = হিমালয় |
| ব্যঞ্জনসন্ধি | ব্যঞ্জনে + স্বর বা ব্যঞ্জন | সৎ + জন = সজ্জন |
| বিসর্গসন্ধি | বিসর্গ (ঃ) + স্বর বা ব্যঞ্জন | পুনঃ + আয় = পুনরায় |
প্রশ্নে "কোন সন্ধি?" জানতে চাইলে প্রথমে দেখো বিচ্ছেদের পর প্রথম অংশের শেষে কী আছে — স্বর, ব্যঞ্জন, নাকি বিসর্গ। এই একটা অভ্যাসেই বেশিরভাগ প্রশ্নের অর্ধেক উত্তর হয়ে যায়।
স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির পার্থক্য নিয়ে সংশয় থাকলে আগে ধ্বনি, বর্ণ ও বর্ণমালার অধ্যায়টা দেখে নাও — ওটা না বুঝলে সন্ধির নিয়মগুলো মুখস্থ ছাড়া উপায় থাকে না।
স্বরসন্ধির নিয়ম
স্বরসন্ধিতে দুটি স্বরধ্বনি মিলে একটি স্বরধ্বনি হয়। এটাই সবচেয়ে বড় ভাগ, আর পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি আসে।
সূত্র এক নজরে
| পূর্বস্বর | পরস্বর | মিলিত হয় | উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| অ/আ | অ/আ | আ | হিম + আলয় = হিমালয় |
| অ/আ | ই/ঈ | এ | নর + ইন্দ্র = নরেন্দ্র |
| অ/আ | উ/ঊ | ও | সূর্য + উদয় = সূর্যোদয় |
| অ/আ | ঋ | অর্ | দেব + ঋষি = দেবর্ষি |
| অ/আ | এ/ঐ | ঐ | জন + এক = জনৈক |
| অ/আ | ও/ঔ | ঔ | মহা + ঔষধ = মহৌষধ |
এই ছয় লাইন মনে রাখলে স্বরসন্ধির বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর হয়ে যায়। এবার প্রতিটা একটু খুলে দেখা যাক।
অ/আ + অ/আ = আ
সবচেয়ে সহজ নিয়ম। দুই পাশে অ বা আ থাকলে মিলে আ হয়।
| সন্ধি বিচ্ছেদ | সন্ধি |
|---|---|
| নর + অধম | নরাধম |
| হিম + আলয় | হিমালয় |
| দেব + আলয় | দেবালয় |
| বিদ্যা + আলয় | বিদ্যালয় |
| মহা + আশয় | মহাশয় |
অ/আ + ই/ঈ = এ এবং অ/আ + উ/ঊ = ও
দুটো আলাদা নিয়ম, কিন্তু একসাথে মনে রাখা সুবিধা — একটায় এ হয়, অন্যটায় ও।
| সন্ধি বিচ্ছেদ | সন্ধি | নিয়ম |
|---|---|---|
| সুর + ইন্দ্র | সুরেন্দ্র | অ + ই = এ |
| গণ + ঈশ | গণেশ | অ + ঈ = এ |
| মহা + ঈশ | মহেশ | আ + ঈ = এ |
| নীল + উৎপল | নীলোৎপল | অ + উ = ও |
| সূর্য + উদয় | সূর্যোদয় | অ + উ = ও |
অ/আ + ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ
| সন্ধি বিচ্ছেদ | সন্ধি | নিয়ম |
|---|---|---|
| দেব + ঋষি | দেবর্ষি | অ + ঋ = অর্ |
| মহা + ঋষি | মহর্ষি | আ + ঋ = অর্ |
| জন + এক | জনৈক | অ + এ = ঐ |
| মত + ঐক্য | মতৈক্য | অ + ঐ = ঐ |
লক্ষ করো, ঋ-এর ক্ষেত্রে ফল হয় অর্ — এখানেই অনেকে ভুল করে ঐ বা ও লিখে ফেলে।
ই/উ + ভিন্ন স্বর = য-ফলা বা ব-ফলা
ই বা উ-এর পরে অন্য কোনো স্বর এলে ই হয়ে যায় য-ফলা (্য), আর উ হয়ে যায় ব-ফলা (্ব)।
| সন্ধি বিচ্ছেদ | সন্ধি | নিয়ম |
|---|---|---|
| অতি + অন্ত | অত্যন্ত | ই + অ = ্য |
| ইতি + আদি | ইত্যাদি | ই + আ = ্য |
| প্রতি + এক | প্রত্যেক | ই + এ = ্য |
| সু + অল্প | স্বল্প | উ + অ = ্ব |
শর্ত একটাই — পরের স্বরটা ভিন্ন হতে হবে। ই + ই হলে এই নিয়ম খাটে না, তখন দীর্ঘ ঈ হয়।
এ, ঐ, ও, ঔ + স্বর
| সন্ধি বিচ্ছেদ | সন্ধি | নিয়ম |
|---|---|---|
| নে + অন | নয়ন | এ + অ = অয়্ |
| গৈ + অক | গায়ক | ঐ + অ = আয়্ |
| পো + অন | পবন | ও + অ = অব্ |
| নৌ + ইক | নাবিক | ঔ + ই = আব্ |
নয়ন, গায়ক, পবন, নাবিক — চারটিই পরীক্ষায় বহুবার এসেছে। এগুলো নিয়ম বুঝে মনে রাখলে আর গুলিয়ে যাবে না।
পুরো স্বরসন্ধি অংশটা উদাহরণ ও অনুশীলনসহ সাজানো আছে স্বরসন্ধির অধ্যায়ে।
ব্যঞ্জনসন্ধির নিয়ম
ব্যঞ্জনসন্ধিতে ব্যঞ্জনধ্বনির সাথে স্বর বা অন্য ব্যঞ্জন মেলে। নিয়ম কম, তাই এই অংশটা তুলনায় সহজ।
ত/দ + চ/ছ = চ্চ বা চ্ছ
- সৎ + চিন্তা = সচ্চিন্তা
- উৎ + চ্বাস = উচ্ছ্বাস
ত/দ + জ = জ্জ, আর ত/দ + হ = দ্ধ
- সৎ + জন = সজ্জন
- উৎ + জ্বল = উজ্জ্বল
- উৎ + হার = উদ্ধার
- পদ + হতি = পদ্ধতি
ম + বর্গীয় ব্যঞ্জন = ঐ বর্গের নাসিক্য ধ্বনি
- সম + চয় = সঞ্চয়
- সম + গীত = সঙ্গীত
- সম + বাদ = সংবাদ
- কিম + কর = কিঙ্কর
এই নিয়মটা বোঝা জরুরি: ম-এর পরে যে বর্গের ব্যঞ্জন আসে, ম বদলে সেই বর্গেরই নাসিক্য ধ্বনি হয়। চ-বর্গ এলে ঞ, ক-বর্গ এলে ঙ।
স্বর বা নাসিক্য ধ্বনি + ছ = চ্ছ
- আ + ছাদন = আচ্ছাদন
- প্র + ছদ = প্রচ্ছদ
- বি + ছেদ = বিচ্ছেদ
বিস্তারিত ব্যঞ্জনসন্ধির অধ্যায়ে আছে।
বিসর্গসন্ধির নিয়ম
বিসর্গ (ঃ) থাকলেই বিসর্গসন্ধি। এটা তিন ভাগে ভাবলে সহজ হয়।
র-জাত বিসর্গ
বিসর্গের আগে অ/আ ছাড়া অন্য স্বর থাকলে, এবং পরে স্বর বা ঘোষ ব্যঞ্জন এলে, বিসর্গ র বা রেফ হয়।
| সন্ধি বিচ্ছেদ | সন্ধি |
|---|---|
| পুনঃ + আয় | পুনরায় |
| পুনঃ + জন্ম | পুনর্জন্ম |
| অন্তঃ + গত | অন্তর্গত |
| অহঃ + নিশা | অহর্নিশ |
স-জাত বিসর্গ
বিসর্গের পরে ক, প বা ত এলে বিসর্গ হয় স বা ষ।
| সন্ধি বিচ্ছেদ | সন্ধি |
|---|---|
| নমঃ + কার | নমস্কার |
| পুরঃ + কার | পুরস্কার |
| তিরঃ + কার | তিরস্কার |
| ভাঃ + কর | ভাস্কর |
নমস্কার আর পুরস্কার — এই দুটোর বানান নিয়েই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়। মনে রাখো, দুটোতেই স।
অ + বিসর্গ + অ বা ঘোষ ব্যঞ্জন = ও
| সন্ধি বিচ্ছেদ | সন্ধি |
|---|---|
| ততঃ + অধিক | ততোধিক |
| মনঃ + অভিলাষ | মনোভিলাষ |
| মনঃ + যোগ | মনোযোগ |
| তপঃ + বন | তপোবন |
মনোযোগ, তপোবন, ততোধিক — এই "ও" কোথা থেকে এল, এই প্রশ্নের উত্তর এখানেই। বাকি নিয়মগুলো বিসর্গসন্ধির অধ্যায়ে।
নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি — যেগুলো নিয়ম মানে না
কিছু শব্দ কোনো নিয়মেই পড়ে না, ব্যবহারের কারণে যেভাবে আছে সেভাবেই স্বীকৃত। এগুলোকে বলে নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি, আর এগুলো মুখস্থ করা ছাড়া উপায় নেই।
- কুল + অটা = কুলটা
- মনস + ঈষা = মনীষা
- গো + অক্ষ = গবাক্ষ
- প্র + ঊঢ় = প্রৌঢ়
- মার্ত + অণ্ড = মার্তণ্ড
সংখ্যায় কম, তাই তালিকাটা একবারে মুখস্থ করে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ। পরীক্ষায় এখান থেকে প্রশ্ন এলে হয় জানো, নয় জানো না — বের করার উপায় নেই। পুরো তালিকা নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধির অধ্যায়ে।
যেসব ভুল সবচেয়ে বেশি হয়
এক, প্রকার চিনতে ভুল। "মনোযোগ" দেখে অনেকে স্বরসন্ধি ভাবে, কারণ ফল হিসেবে "ও" এসেছে। কিন্তু বিচ্ছেদ করলে পাওয়া যায় মনঃ + যোগ — বিসর্গ আছে, তাই বিসর্গসন্ধি। ফল দেখে নয়, বিচ্ছেদ দেখে প্রকার ঠিক করো।
দুই, ঋ-এর নিয়ম গুলিয়ে ফেলা। অ + ঋ = অর্, কিন্তু অনেকে ঐ বা ও লিখে দেয়। দেবর্ষি ও মহর্ষি — দুটোতেই "র্" আছে, এটাই সংকেত।
তিন, য-ফলার শর্ত ভুলে যাওয়া। ই + ভিন্ন স্বর হলেই য-ফলা। কিন্তু পরের স্বর যদি ই-ই হয়, তখন নয়। "অতি + অন্ত = অত্যন্ত" হয়, কারণ পরে অ আছে।
চার, নিপাতনে সিদ্ধ শব্দে নিয়ম খোঁজা। গবাক্ষ বা প্রৌঢ় কেন এমন হলো তার ব্যাখ্যা খুঁজে সময় নষ্ট কোরো না — এগুলোর ব্যাখ্যা নেই।
বিসিএসে সন্ধি থেকে যা আসে
প্রশ্ন সাধারণত তিন রকম হয়:
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো — "মনীষা" শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ কী? (উত্তর: মনস + ঈষা)
- সন্ধি করো — "নর + ইন্দ্র" মিলিত রূপ কী? (উত্তর: নরেন্দ্র)
- প্রকার শনাক্ত করো — "পুনরায়" কোন সন্ধির উদাহরণ? (উত্তর: বিসর্গসন্ধি)
বারবার ঘুরেফিরে আসা শব্দগুলো হলো — মনীষা, গবাক্ষ, পরীক্ষা, নমস্কার, পুরস্কার, মনোযোগ, তপোবন, উজ্জ্বল, সজ্জন, সংবাদ, নয়ন, নাবিক, জনৈক, মহর্ষি।
কোন বিসিএসে কোনটা এসেছে সেটা দেখতে চাইলে বাংলা ভাষার প্রশ্নব্যাংকে বিষয়ভিত্তিক সাজানো আছে — একই প্রশ্ন কতবার এসেছে সেটাও দেখা যায়।
কোথা থেকে শুরু করবে
নিয়ম পড়ে ফেলা আর নিয়ম আয়ত্তে আসা এক জিনিস নয়। যে ক্রমে এগোলে সবচেয়ে দ্রুত কাজ হয়:
- স্বরসন্ধির ছকটা মুখস্থ করো — উপরের ছয় লাইন। এটাই সবচেয়ে বেশি নম্বর দেয়।
- ব্যঞ্জনসন্ধির চারটি সূত্র ধরো — উদাহরণসহ, নিয়ম আলাদা করে নয়।
- বিসর্গসন্ধি তিন ভাগে ভাগ করে পড়ো — র-জাত, স-জাত, আর ও-জাত।
- নিপাতনে সিদ্ধ তালিকা একবারে মুখস্থ করে ফেলো।
- অনুশীলন করো — বাংলা ভাষার প্রশ্নে প্র্যাকটিস করলে প্রতিটি উত্তরের সাথে সাথেই ব্যাখ্যা পাবে, আর ভুলগুলো নিজে থেকেই ভুল খাতায় জমা হবে।
পুরো অধ্যায়টা ধাপে ধাপে পড়তে চাইলে সন্ধি অধ্যায় থেকে শুরু করো — প্রতিটি টপিকের শেষে ছোট কুইজ আছে, তাই পড়ার সাথে সাথেই যাচাই হয়ে যায়।
শেষ কথা
সন্ধি এমন একটা অধ্যায় যেখানে পরিশ্রমের ফল সবচেয়ে নিশ্চিত। সূত্রগুলো সীমিত, উদাহরণ বারবার ঘুরেফিরে আসে, আর প্রশ্নের ধরনও বদলায় না। এক সপ্তাহ নিয়মিত সময় দিলে এই অধ্যায় থেকে নম্বর হারানোর কারণ আর থাকে না।
শুধু একটা কথা মনে রেখো — উদাহরণ মুখস্থ কোরো না, নিয়ম বুঝে নাও। পরীক্ষায় অচেনা শব্দ এলে মুখস্থ কাজে আসবে না, নিয়ম আসবে।
Ahosan Habib
@ahosanhabib922
অচিনপুরের নির্মাতা। BCS ও চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে লেখেন — সিলেবাস, ব্যাকরণ ও পড়ার কৌশল।